সানস্ক্রিন কি ভিটামিন ডি তৈরিতে বাধা দেয় ?
সানস্ক্রিন : কিছুক্ষণ রোদে দাঁড়িয়ে থাকলে ইউ ভি ‘বি’ রশ্মির প্রভাবে আমাদের গায়ের রঙ লালচে হয়ে ওঠে। অথচ সানস্ক্রিন মেখে রোদে দাঁড়ালে ত্বকের লাল হয়ে উঠতে বেশি সময় লাগবে। ধরা যাক, স্বাভাবিক অবস্থায় চার মিনিট পরে ত্বক লাল হয়ে ওঠে, সানস্ক্রিন লাগালে সেটাই হয়ত বেড়ে ৬০ মিনিট হয়ে যাবে। এখন দামি সানস্ক্রিন মানেই যে ভাল ও কার্যকর- এই ধারণা ঠিক নয়। তাই অনেক খরচ করে দামি সানস্ক্রিন কিনলেই কাজ হবে- এমন ভাবনা ভুল। বরং দাম দিয়ে মান বিবেচনা না করে, লেবেল দেখে নিশ্চিত হয়ে তবেই সানস্ক্রিন কেনা উচিত।
কী ( সানস্ক্রিন-এ ) দেখতে হবে?
লেবেলেই সানস্ক্রিন সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য দেওয়া থাকে। সেটা মন দিয়ে পড়ে তবেই কিনুন। সানস্ক্রিন কেনার আগে ‘এসপিএফ’-এর সঙ্গে পরিচয় সেরে নেওয়া উচিত। ‘এসপিএফ’ একটি সংক্ষিপ্ত শব্দ, যার পুরোটা হল- ‘সান প্রোটেকশন ফ্যাক্টর’। প্রথমেই লেবেলে দেওয়া এসপিএফ নম্বর দেখে নিন। এই নাম্বার দিয়ে সানস্ক্রিনের গুণাগুণ বিচার করা হয়। এসপিএফ নম্বর যত বেশি, ত্বকের সুরক্ষায় সেটি তত বেশি কার্যকর। সাধারণ ভাবে এসপিএফ নম্বর ১৫ বা তার বেশি হওয়া ভাল। কারণ, তাহলেই আলট্রা-ভায়োলেট রশ্মির দাপট থেকে ত্বক প্রকৃত সুরক্ষা পায়।
নজর থাকুক এদিকেও
এসপিএফ সংখ্যার পাশাপাশি সানস্ক্রিনটি ব্রড স্পেকট্রামের কি না, তা-ও পরখ করে নেওয়া জরুরি। ব্রড স্পেকট্রাম লেখা সানস্ক্রিনগুলি ইউ ভি এ এবং ইউ ভি বি- এই দুই রশ্মি থেকেই ত্বককে রক্ষা করে। এদিকে PA+, PA++, PA+++ বা PA++++ চিহ্নগুলি ইউ ভি এ সুরক্ষার মান বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। যত বেশি ‘+’ থাকবে, তত বেশি সুরক্ষা মিলবে। এক্ষেত্রে PA+++ বা PA++++ বেছে নেওয়াই সঙ্গত। এছাড়া নন-কমেডোজেনিক সানস্ক্রিন মাখাই ঠিক। এতে সানস্ক্রিন মাখলেও ত্বকের ছিদ্র বন্ধ হয়ে যায় না। তার ফলে ব্রণ হওয়ার অন্যতম কারণ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। তাই যে ত্বকে ব্রণ বেশি হয়, সে ধরনের ত্বকের পক্ষে নন-কমেডোজেনিক সানস্ক্রিনই সেরা। এছাড়া সানস্ক্রিনকে হতে হবে জলরোধী। তাহলে গরমে ঘামলে বা জল লাগলেও তা বেশিক্ষণ কার্যকর থাকবে।
ত্বক বুঝে সানস্ক্রিন
ত্বকের ধরন ও সানস্ক্রিনের মধ্যে কিন্তু গভীর সম্পর্ক আছে। সবার ত্বকের ধরন এক রকমের নয়। এই গরমে কারও ত্বক থেকে অতিরিক্ত তেল বেরোয়। আবার কারও ত্বক ভ্যাপসা গরমেও যেন মরুভূমির মতো রুক্ষ- শুকনো। তাই এই দু’ধরনের ত্বকের জন্য সানস্ক্রিনের ধরনও আলাদা হওয়ারই কথা। তৈলাক্ত ত্বকের পক্ষে সেরা পছন্দ জেল বা ম্যাট ফিনিশড সানস্ক্রিন। অন্যদিকে শুকনো ত্বকের পক্ষে ক্রিম-বেসড বা ময়শ্চারাইজিং সানস্ক্রিন উপযুক্ত। এখানেই শেষ নয়। কিছু কিছু ত্বক সংবেদনশীল। সেরকম ত্বকে জিঙ্ক অক্সাইড বা টাইটেনিয়াম ডাইঅক্সাইডের মতো মিনারেল-যুক্ত সানস্ক্রিন লাগানো দরকার। এছাড়া আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা- সানস্ক্রিনকে সুগন্ধি ও রাসায়নিকহীন হতে হবে। সানস্ক্রিন কেনার সময় ওপরে আলোচিত সব দিক বিবেচনা করা উচিত। তবেই তা মেখে হাতেনাতে উপকার মিলবে।
সানস্ক্রিন ভিটামিন ডি তৈরিতে বাধা হয়ে ওঠে না তো?
প্রশ্নটা খুব প্রাসঙ্গিক। শরীরে ভিটামিন ডি-র অভাবে একাধিক রোগ হানা দিতে পারে। ভিটামিন ডি-র সব চেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ উৎস সূর্যালোক। সূর্যের আলো আমাদের ত্বকে এসে পড়ার পরে কোলেস্টেরল থেকে ভিটামিন ডি সংশ্লেষ করে। এক্ষেত্রে সূর্যের ইউ ভি বি রশ্মির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে।
অন্যদিকে সূর্যরশ্মির হাত থেকে ত্বক বাঁচাতে সানস্ক্রিন ইউ ভি এ এবং ইউ ভি বি রশ্মিকে আড়াল করে। সুতরাং, এমন মনে হওয়া খুব স্বাভাবিক যে, সানস্ক্রিনের কারণে ত্বকে ভিটামিন ডি-র সংশ্লেষণ বাধাপ্রাপ্ত হবে।
তবে ধারনাটি অমূলক, কারণ সানস্ক্রিন মাখলে ভিটামিন ডি সংশ্লেষণ বাধাপ্রাপ্ত হয় না। তাই ভিটামিন ডি তৈরিতে সানস্ক্রিন বাধা হয়ে ওঠে- এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা এবং এর পেছনে কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ভারতীয়দের মধ্যে এমনিতেই ভিটামিন ডি-র ঘাটতি আছে। এর সঙ্গে সানস্ক্রিন মাখা বা না মাখার কোনও সম্পর্ক নেই। তাই ভিটামিন ডি-র কথা ভেবে সানস্ক্রিন এড়িয়ে যাওয়া বোকামি। তাতে উল্টে ত্বকের ক্ষতি হতে পারে। এছাড়া ডায়েটে বেশি করে ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার রাখা যেতে পারে। যেমন- দুধ, ফ্যাটি ফিশ, মাশরুম ইত্যাদি।
ওরাল সানস্ক্রিন কী?
ওরাল সানস্ক্রিন একটি ডায়েটারি সাপ্লিমেন্ট। লিকুইড বা ট্যাবলেট ফর্মে এটি পাওয়া যায়। এই সানস্ক্রিন অতিবেগুনি রশ্মিকে ঠেকিয়ে দেওয়ার জন্য শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। তাছাড়া এরা শরীরে ফ্রি ব়্যাডিকেলের ক্ষতিও কমিয়ে দেয়। সব মিলে ওরাল সানস্ক্রিন শরীরের ভেতর থেকে অতিবেগুনি রশ্মির বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়।

ওরাল সানস্ক্রিনে কী কী থাকে?
ওরাল সানস্ক্রিন ভিটামিন ই, সি এবং কে-র মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ঠাসা হয়। এতে মূলত পলিপোডিয়াম লিউকাটোমোস থাকে, যা ট্রপিক্যাল ফার্ন পাতার প্রাকৃতিক নির্যাস। এদের উচ্চ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ধর্ম আছে। এছাড়াও এর মধ্যে ভিটামিন সি এবং ভিটামিন ই থাকে। এরা ইউভি রশ্মি থেকে শরীরে তৈরি হওয়া ফ্রি ব়্যাডিক্যাল নষ্ট করতে সাহায্য করে। এদিকে ওরাল সানস্ক্রিনে বিটা-ক্যারোটিন, লাইকোপিনের মতো ক্যারোটিনয়েড, অ্যাস্টাজ্যান্থিন, রেসভেরাট্রল, গ্রিন টি ও পলিফেনলের মতো এজেন্টও ব্যবহার করা হয়। এসব উপাদান একত্রে ত্বককে অতিবেগুনি রশ্মির ক্ষতি থেকে বাঁচায়। তা-ও এর কার্যকারিতা নিয়ে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়।
তাহলে এই সানস্ক্রিন কি আদৌ কার্যকর নয়?
স্পষ্ট করে জানাই- ওরাল সানস্ক্রিনের খুব বেশি কার্যকারিতা নেই। কারণ, এরা পুরোপুরি ইউভি রশ্মি থেকে সুরক্ষা দিতে পারছে কি না, তেমন কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মেলেনি। তাই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা না পাওয়া পর্যন্ত বাইরে থেকে সানস্ক্রিন লাগিয়েই সূর্যরশ্মির ক্ষতি ঠেকানো উচিত। সেক্ষেত্রে ত্বক বাঁচাতে ওরাল সানস্ক্রিন নিলেও, মুখ ও হাতে গায়ে-লাগানোর সানস্ক্রিন নিয়মমাফিক মাখতেই হবে।
সানস্ক্রিন মেখেও কেন চামড়া ট্যান হয়?
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মেনে ড্রেসিং টেবিলে সানস্ক্রিনকে পাকাপাকি জায়গা দিয়েছেন অনেকে। রোদে বেরোনোর আগে, তা মেখেও নিচ্ছেন। অথচ এরপরও বাড়ি ফিরে দেখছেন- ত্বক ঝলসে গিয়েছে, চামড়ার বিভিন্ন অংশে পড়েছে ট্যান। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগছে, সানস্ক্রিন তো মাখলাম, কিন্তু তারপরও কেন ট্যান? তাহলে কি সানস্ক্রিনের কোনও কার্যকারিতাই নেই? আপনার ভাবনাকে সম্মান জানিয়ে বলি- সানস্ক্রিন মাখার ভুলেই ত্বক ট্যানড্ হতে পারে। দিনের পর দিন শুধু সানস্ক্রিন মেখে গেলেই চলবে না।
মাখতে হবে সঠিক নিয়ম মেনে। তাহলেই সূর্যরশ্মির থেকে সুরক্ষা মিলবে। নয়তো সানস্ক্রিন মেখেও ঝলসে যেতে পারে ত্বক। এছাড়া শুধু মুখ নয়- গলা, ঘাড়, কানের পেছন- শরীরের যে যে অংশে রোদ্দুর পড়ছে, সেখানেই সানস্ক্রিন লাগান। অনেকে শুধুমাত্র মুখে সানস্ক্রিন মেখে বেরিয়ে পড়েন, হাতকে গুরুত্বই দেন না। সেজন্য হাত বেশি ট্যানড্ হয়। হাতেও পর্যাপ্ত পরিমাণে সানস্ক্রিন লাগাবেন এবং সানস্ক্রিনকে দায়সারা ভাবে নেবেন না।
Q1. সানস্ক্রিন কি ভিটামিন ডি তৈরিতে বাধা দেয়?
না। বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুযায়ী, সঠিকভাবে সানস্ক্রিন ব্যবহার করলেও ভিটামিন ডি সংশ্লেষণ বন্ধ হয় না।
Q2. ভিটামিন ডি তৈরিতে সূর্যের কোন রশ্মি কাজ করে?
সূর্যের ইউভি বি (UV-B) রশ্মি ত্বকে ভিটামিন ডি তৈরিতে প্রধান ভূমিকা রাখে।
Q3. SPF বেশি হলে কি ভিটামিন ডি শোষণ কমে যায়?
না। SPF মূলত সূর্যজনিত ত্বক পোড়া প্রতিরোধ করে; এটি ভিটামিন ডি তৈরিকে সম্পূর্ণরূপে আটকে দেয় না।
Q4. ওরাল সানস্ক্রিন কি টপিক্যাল সানস্ক্রিনের বিকল্প?
না। ওরাল সানস্ক্রিনের কার্যকারিতা প্রমাণিত নয়, তাই এটি গায়ে লাগানো সানস্ক্রিনের বিকল্প হতে পারে না।
Q5. সানস্ক্রিন মাখার পরেও কেন ত্বক ট্যান হয়?
ভুল নিয়মে বা পর্যাপ্ত পরিমাণে সানস্ক্রিন না লাগালে ত্বক ট্যান হতে পারে।
এমন আরও অনুপ্রেরণাদায়ক টেক-গল্প জানতে ভিজিট করুন wwwl.ittlesgreat.com – যেখানে আমরা নিয়ে আসি প্রযুক্তির অজানা গল্প, ইতিহাস ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি।
যদি তুমি প্রাকৃতিক উপাদান সমৃদ্ধ, গবেষণা-ভিত্তিক উপকারি তেল খুঁজো, তাহলে দেখতে পারো LittlesGreat Homemade Hair Oil

